চ্যানেল আই আয়োজিত স্মরণ সভায় আমীরুল ইসলামকে নিয়ে ছড়াকার আসলাম সানী

বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলামের প্রয়াণে শোকের ছায়া শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চ্যানেল আইয়ের স্টুডিও বারান্দায় অনুষ্ঠিত হলো আমীরুল ইসলামের স্মরণ সভা।
এদিন আমীরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানের শুরুতে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। পরে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, লেখক, বন্ধু ও স্বজন।
সহকর্মী ও আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান আমীরুল ইসলামের স্মরণ সভাটি উপস্থাপনা করেন। তিনি জানান, আমীরুল ইসলাম সবাইকে ভালোবাসতেন, কিন্তু দুজন মানুষকে ভীষণ ভালোবাসতেন, তাদের কথা শুনতেন। তাদের একজন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, এবং অন্যজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর।
রেজানুর বলেন, আমি সাগর ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম আজকে আমীরুলের স্মরণ সভা, আপনি থাকছেন তো? সাগর ভাই হঠাৎ করে চোখের পানি ফেলে বললেন ‘রেজানুর, আমি ওর স্মরণ সভায় স্মরণ কথাগুলো শুনতে পারবো না। আমার পক্ষে সম্ভব না।’
স্মরণ সভায় আমীরুল ইসলামকে নিয়ে ধারাবাহিক স্মৃতিচারণ করেন সহকর্মী ও অভিনেতা শহীদুল আলম সাচ্চু, অভিনেত্রী আফসানা মিমি, সুরের ধারার পক্ষ থেকে রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী সাথী সরকার, ইফতেখারুল ইসলাম, প্রকাশক ফরিদ আহমেদ, মিলা মাহফুজ, তরুণ প্রকাশক ও আমীরুল ইসলামের শিষ্য মোরসালিন, ছড়াকার আনজীর লিটন, আমীরুল ইসলামের বড় ভাই কামাল আহমেদ, সহকর্মী ও কবি রাজু আলীম, ছড়াকার আসলাম সানী, সোহেল মল্লিকসহ বহু গুণীজন।
স্মরণ সভার শুরুতেই আমীরুল ইসলামকে নিয়ে কথা বলেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। তিনি আমীরুল ইসলামকে নিয়ে বলেন, আমীরুলের সাথে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সেই কথায় না গেলাম, তার অসুস্থতা পরবর্তী সময়ের কথাই যদি বলি; যখন সে চোখ দুটি হারালো, আমি বিস্মিত হয়ে যাই- তার ভেতরকার শক্তি দেখে, আমরা হলে অনেকই আগেই নিভে যেতাম। কিন্তু তার যে চোখ নেই এ নিয়ে আমীরুলের মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা দেখিনি।
অতি সাম্প্রতিক একটি স্মৃতির কথা তুলে ধরে শাইখ সিরাজ বলেন,“কিছুদিন আগে আমি বগুড়ায় মাটি ও মানুষের শুটিংয়ে গিয়েছিলাম, সেখানের একটি স্থানীয় হাটের। আমীরুলের সাথে দেখা হলে সে আমাকে বললো ‘বস, বগুড়ার ওই হাটটা দেখাইলেন’! আমি বললাম ‘তুমি তো চোখে দেখতে পাও না, তাহলে কী করে দেখলে?’ আমীরুল বললো ‘একবার কেউ যদি কোনো জিনিস দেখে ফেলে, তার স্মৃতিশক্তি চলে গেলেও সেই দৃষ্টি দিয়ে সে একই জিনিস দেখে।”
“শেষ দিকে আমীরুলের জীবনটা খুব সুখকর ছিলো না, কিন্তু প্রতিদিন সে অফিসে আসতো। আমি তাকে বারণ করতাম, এই শরীরে তুমি অফিসে না আসলেও তো পারতে। সে বলতো ‘অফিসে না আসলে ভাল লাগে না বস।’ তার ভেতরে যে শক্তি, অসম্ভব শক্তি। আমি তাকে প্রায়ই বলতাম, ‘তোমার মতো আমার এরকম হলে তো অফিসে আসার চিন্তাই করতাম না।’ কিন্তু একজন মানুষের ভেতরকার শক্তি এতো প্রখর হয়, সেটা আমি আমীরুলকে দেখে বুঝেছি।” বলেন শাইখ সিরাজ।
চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন,“আমীরুলকে আমি চিনি চ্যানেল আইয়ের একেবারে শুরু থেকে। তখন সে কী করে জানতাম না। আমীরুল যে ছড়াকার, নানা বিষয়ে লেখে- এগুলো জানতাম না। মজার ব্যাপার হলো- ও বিভিন্ন বিষয়ে নাম দিতো। স্টুডিও বারান্দা, ছাদ বারান্দা- চ্যানেল আইয়ের বিভিন্ন কর্নারের নাম এগুলো কিন্তু আমীরুলের কনসেপ্ট। গ্র্যান্ড ফিনালের বাংলা যে ‘মহ্যোৎসব’- এটা কিন্তু আমাদের মাথাতেই আসেনি, এটাও আমীরুলের দেয়া। এই ধরনের অনেক নাম ও শব্দ কিন্তু আমীরুল ইন্ট্রিডিউস করেছেন।”
আমীরুল ইসলামের স্মরণ সভায় চ্যানেল আইয়ের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন বলেন,“আমীরুলকে নিয়ে কথা বলার জন্য দু’চার ঘণ্টা সময় যথেষ্ট নয়। আমি শুধু বলতে চাই, মাত্র ৬২ বছর বয়সে আমীরুলের যা কীর্তি- এটা অভিভূত হওয়ার মতো। গত চার পাঁচ বছর আমীরুল শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলো, কিন্তু সেটা তার সৃষ্টিশীলতায় কোনো প্রভাব ফেলেনি।”
এসময় তিনি আমীরুল ইসলামের সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষিদের তার সাহিত্যকর্ম ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান।
ছড়াকার আসলাম সানী বলেন,“লেখকদের মঙ্গল কামনায় আমীরুলের পুরো জীবন কেটেছে। শেষ দিকে অসুস্থতার কারণে তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে, চোখে দেখতে পায়নি কিন্তু লেখা থামাননি।”
এসময় আসলাম সানী বলেন,“আমীরুল দেখতে পেতো না, কিন্তু সে অন্ধ ছিলো এটা বলা যাবে না। আমীরুলের যে দিব্যজ্যোতি, খুব কম মানুষের হয়। লেখকদের তো বটেই। যে কারণে আমি আমীরুলকে বলি আমাদের সময়কালের দার্শনিক। আমি আমীরুলকে দেখেছি, সমৃদ্ধ হয়েছি।”
আশির দশকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন,“আমীরুল যখন ঢাকা কলেজের বার্ষিক সম্পাদক হয়, তখন তার কী বিপুল জনপ্রিয়তা- ভাবা যায় না। সেই আশির দশকে আমীরুলের কী জনপ্রিয়তা, সেটা আমি দেখেছি।”
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

