সুরের রঙমহলে অনিমা ডি কস্টার মায়াবী সন্ধ্যা – DesheBideshe

সুরের রঙমহলে অনিমা ডি কস্টার মায়াবী সন্ধ্যা – DesheBideshe


সুরের রঙমহলে অনিমা ডি কস্টার মায়াবী সন্ধ্যা – DesheBideshe

টরন্টোর হাঙ্গেরিয়ান কালচারাল সেন্টারে ২৭ জুন ২০২৬ সন্ধ্যাটি শুরু হয়েছিল সময় মেনে, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সাতটায়। কিন্তু গান শুরু হওয়ার পর সময়ের হিসাব সেদিন বেশিক্ষণ টেকেনি। ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ততা পেছনে সরে গেল। সামনে শুধু রইল আলো, মঞ্চ, সুর, স্মৃতি আর এক শিল্পীর কণ্ঠে বহু দিনের চেনা সময়ের ফিরে আসা।

D5events আয়োজিত অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘সুরের রঙমহল’। নামের ভেতরেই ছিল রঙ, সুর, আবহ আর স্মৃতির ইঙ্গিত। কিন্তু সত্যি বলতে, অনুষ্ঠানটি যে এত সুন্দরভাবে আমাকে ছুঁয়ে যাবে, তা আমি আগে ভাবিনি। অনেক অনুষ্ঠানেই যাই, কিন্তু কিছু সন্ধ্যা থাকে, যেগুলো কেবল দেখা বা শোনা হয় না, অনুভব করা হয়। ‘সুরের রঙমহল’ ছিল তেমনই এক সন্ধ্যা।

চার ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজন শেষ হয় প্রায় রাত ১১টায়। পুরো অনুষ্ঠানটি অনেকেই মন দিয়ে শুনেছেন। কেউ চোখ বন্ধ করে গানের ভেতর ডুবে গেছেন, কেউ আবার পরিচিত কোনো সুর শুরু হতেই ফিরে গেছেন বহু বছর আগের কোনো বিকেলে, কোনো রেডিওর সামনে, কোনো পারিবারিক আসরে, কিংবা হারিয়ে যাওয়া প্রিয় কোনো সময়ের কাছে।

সেদিন সুরের রঙমহলকে আসল অর্থে রঙিন করে তুলেছিলেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী অনিমা ডি কস্টা। তাঁর কণ্ঠে ছিল পরিণত অভিজ্ঞতার মাধুর্য, আবেগের গভীরতা এবং গানের প্রতি দীর্ঘ সাধনার ছাপ। তিনি গান গাইছিলেন, কিন্তু শুধু সুর তুলছিলেন না; প্রতিটি গানের ভেতর দিয়ে এক একটি সময়কে মঞ্চে ফিরিয়ে আনছিলেন। তাঁর পরিবেশিত প্রতিটি গান যেন ছিল একটি স্মৃতি, প্রতিটি সুর যেন ছিল জীবনের কোনো পুরোনো ছবির দরজা খুলে দেওয়া।

হারানো দিনের গান, প্রেম, বিরহ, আনন্দ, স্মৃতিকাতরতা, আধুনিক বাংলা গান, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সুর, আবার সেই সঙ্গে লোকগানের মাটির গন্ধ, সব মিলিয়ে অনিমা ডি কস্টা সেদিন সুরের নানা রঙে মঞ্চ সাজিয়েছিলেন। শাহনাজ রহমতউল্লাহ, সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লার কালজয়ী গানগুলো যখন তাঁর কণ্ঠে ভেসে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল, বাংলা গানের এক সোনালি অধ্যায় যেন আবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আলাউদ্দিন আলীর সুরের গানগুলোও তিনি পরিবেশন করেন গভীর মমতায়। এসব গান আমাদের অনেকের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

অনিমা ডি কস্টার গায়কীর বড় শক্তি তাঁর বহুমুখিতা। তিনি এক ধরনের গানে আটকে থাকেন না। আধুনিক গান থেকে চলচ্চিত্রের গান, প্রেমের গান থেকে বিরহের সুর, আবার লোকজ আবহের গান, সবকিছুতেই তাঁর কণ্ঠ আলাদা মাত্রা পায়। তাঁর গানে আবেগ আছে, কিন্তু বাড়াবাড়ি নেই। মাধুর্য আছে, কিন্তু কৃত্রিমতা নেই। এ কারণেই শ্রোতারা তাঁর গান শুধু শোনেন না, বিশ্বাস করেন।

অনুষ্ঠানের আরেকটি সুন্দর দিক ছিল উপস্থাপনা। ফ্লোরা সূচি, রিক্তা মজুমদার ও জুলিয়ানা রিনির উপস্থাপনায় ছিল পরিমিতি, সৌন্দর্য, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং মঞ্চের প্রতি যথাযথ সম্মান। তাঁরা অপ্রয়োজনীয় কথায় অনুষ্ঠানকে ভারী করেননি; বরং শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে সহজ একটি সেতু তৈরি করে দিয়েছেন।

যন্ত্রসংগীতেও সেদিন ছিল বিশেষ প্রাণ। কি-বোর্ডে রূপতনু শর্মা, তবলায় আতিকুর রহমান, অক্টোপ্যাডে রনি পালমার এবং গিটারে আবির দাস শিল্পীর কণ্ঠকে সুন্দরভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের বাজনায় ছিল সংযম, দক্ষতা এবং গানের মেজাজ বুঝে সঙ্গে থাকার ক্ষমতা। সেদিন যন্ত্রশিল্পীরা শুধু সঙ্গত করেননি; গানের আবহকে আরও পূর্ণ করেছেন। সাউন্ড সাপোর্টেও ছিল প্রশংসনীয় যত্ন। ‘ড্যানফোর্থ সাউন্ড’ শিল্পীর কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতের ভারসাম্য সুন্দরভাবে ধরে রেখেছিল।

অনিমা ডি কস্টার সঙ্গীতজীবনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাধনা। তাঁর গানের শুরু পরিবার থেকে। অল্প বয়সেই তিনি সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং পরবর্তীতে গানকে জীবনের পেশা ও সাধনা হিসেবে বেছে নেন। বাবা-মায়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তাঁর পথচলায় বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি সঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন দয়াল চন্দ্র মন্ডল, ওস্তাদ মঙ্গল চন্দ্র মন্ডল এবং ওস্তাদ আখতার সাদমানির কাছে। সেই শিক্ষার ছাপ তাঁর গানে স্পষ্ট। সুরের প্রতি শ্রদ্ধা, উচ্চারণে যত্ন, আবেগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং শ্রোতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সহজ শক্তি তাঁর গানে স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়।

‘সুরের রঙমহল’ তাই কেবল একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল স্মৃতি, সুর ও অনুভবের এক সুন্দর সন্ধ্যা। D5events একটি পরিমিত, পরিচ্ছন্ন ও হৃদয়ছোঁয়া আয়োজন উপহার দিয়েছে। অনিমা ডি কস্টার কণ্ঠে সেদিন বাংলা গানের যে রঙ ছড়িয়ে পড়েছিল, তা অনেক দিন শ্রোতাদের মনে থাকবে। অনুষ্ঠান শেষে হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমার মনে হচ্ছিল, কিছু সন্ধ্যা শেষ হয় না; শুধু মঞ্চের আলো নিভে যায়, সুরের আবেশ থেকে যায় বহুদিন।

এনএন/ ২৮ জুন ২০২৬